নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। মূল জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো কার্যক্রম আবার পুরোদমে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরও চলছে নিয়মিত।
তবে ব্যবসায়ী মহল বলছে, স্বস্তি ফিরলেও দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপ এবং একের পর এক কর্মসূচির কারণে বারবার অচল হয়েছে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম। একটি কর্মসূচি প্রত্যাহার হতেই আরেকটি শুরু হওয়ায় আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সরকারের অধীনে টেকসই ও নিরবচ্ছিন্ন বন্দর সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যানুযায়ী, দেশের সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং মোট আমদানি-রফতানি পণ্যের ৮৭ শতাংশ এ বন্দর দিয়ে আনা-নেয়া করা হয়। শনিবার বন্দরের মূল জেটিতে জাহাজে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সচল ছিল। একই সময়ে বহির্নোঙরে অবস্থান করেছে অর্ধশতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ। এর মধ্যে ২৫টি জাহাজে প্রায় ১৫ লাখ টন ভোগ্যপণ্য রয়েছে। এসব বড় জাহাজের পণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করে নদীপথে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন ঘাটে পাঠানো হচ্ছে। বড় জাহাজ থেকে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রফতানির অপেক্ষায় থাকা পণ্য পাঠানো হচ্ছে বন্দরের জেটিতে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়ে। গত বছর কাস্টমস কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কর্মসূচি, পরিবহন ধর্মঘট এবং সর্বশেষ শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত—প্রতিটি ইস্যুতেই বন্দরের কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে জাহাজজট তৈরি হয়েছে এবং আমদানীকৃত কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য হাতে পেতে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছরজুড়ে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজ বন্দরে পৌঁছালেও পণ্য হাতে পেতে বিলম্ব হয়েছে। একবার জাহাজজট তৈরি হলে উৎপাদনমুখী খাতের উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিন ভুগতে হয়। এতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া বন্দর সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা আশা করি, নির্বাচিত সরকার প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড জোরদার করে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করবে। রফতানি খাতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নেয়া জরুরি।’
টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব ভোক্তা বাজারে পড়ে। সাম্প্রতিক অস্থিরতায় সাপ্লাই চেইন চরম ঝুঁকিতে পড়েছিল। ব্যবসায়ীরা দায়ী না হলেও জাহাজ দিনের পর দিন বসে থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। বহির্নোঙরে খালাস কার্যক্রম বন্ধ থাকলে কারখানা বা গুদাম পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে। বড় কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেয়া উচিত।’
ব্যবসায়ী মহলের অভিমত, অভ্যন্তরীণ দাবি-দাওয়া কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যেন আমদানীকৃত কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক সমন্বয় ও জবাবদিহি জোরদার হলে যেকোনো অস্থিরতা দ্রুত মোকাবেলা করা সম্ভব। অন্যথায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সি-কম গ্রুপ ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে অপেক্ষাসহ প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যায়, যেখানে বিশ্বের অনেক বন্দরে দিনে দিনে খালাস সম্পন্ন হয়। খালাস প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে স্টোর রেন্ট ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। ব্যবসার এ অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ হিসেবে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বন্দর সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।’
এশিয়ান ডাফ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘নানা ইস্যুতে বন্দরে রফতানি কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের যথাযথ পদক্ষেপে বন্দরের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
সব মিলিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও ব্যবসায়ী মহল এখন স্থায়ী সমাধান ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের স্থিতিশীলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, এমনটাই বলছেন তারা।